বাংলাদেশ   রবিবার ১১ জানুয়ারি ২০২৬, রবিবার ২৭ পৌষ ১৪৩২

মানুষের যেদিন সেন্স অব হিউমার চলে যায়, হি ইজ ওল্ড

মো: নাঈমুর রহমান

প্রকাশিত: ০৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:০৭ PM

মানুষের যেদিন সেন্স অব হিউমার চলে যায়, হি ইজ ওল্ড

ছবি: সংগৃহীত

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো আয়োজনে এবারের অতিথি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। মনিরুল ইসলামের জন্ম জামালপুরে, শৈশব কিশোরগঞ্জে, কৈশোরে পরীক্ষার জন্য চাঁদপুরে, তারপর ঢাকার চারুকলা, আর সেখান থেকে স্পেন—দেশ থেকে দেশান্তরে নদীর মতো বয়ে চলা এক জীবন। তাঁর জীবনের নানা বাঁক আর অভিজ্ঞতা–উপলব্ধি উঠে এসেছে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে।

আনিসুল হক: 

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আজ আমাদের অতিথি আন্তর্জাতক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের একজন প্রধান শিল্পী মনিরুল ইসলাম। তিনি বাংলাদেশের মানুষ, তবে স্প্যানিশও বটে। পৃথিবীজুড়েই তাঁর খ্যাতি। তাঁর জীবন—শিল্পীর জীবন, আমরা তাঁর কাছ থেকে অভিজ্ঞতার কথা শুনব এবং নিশ্চয়ই ঋদ্ধ হব। মনিরুল ইসলাম ভাই, আপনাকে স্বাগত জানাই প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজনে।

মনিরুল ইসলাম: ধন্যবাদ।

আনিসুল হক: 

আমরা এ অনুষ্ঠানে সারা জীবনের কথাই শুনি। আপনারটাও তা–ই হবে। তো আপনার সম্পর্কে দুটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে অনলাইনে। একটা তথ্যে বলা হচ্ছে, আপনার জন্ম চাঁদপুরে, আরেকটায় বলা হচ্ছে জামালপুরে। আসলে আপনার জন্ম কোথায়?

মনিরুল ইসলাম: আমার জন্ম জামালপুরে। ৩ মাস বয়স যখন, বাবা চাকরি করতেন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে, তখন বদলি হয়ে যান কিশোরগঞ্জে। কিশোরগঞ্জে আমার শৈশবকাল। মানে ২২ বছর ধরে কিশোরগঞ্জে আমি ছিলাম, এর বাইরে কোনো সময় কোনো দেশে যাইনি।

আনিসুল হক: 

না, কিন্তু চাঁদপুরে আপনার সঙ্গে সামসুল ওয়ারেস যে পড়তেন?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, আমার এডুকেশন লাইনটা একটু ডিস্টার্বড। বাট, বলে না, জীবনানন্দের কবিতা—‘জীবনের গভীরতম বেদনার মধুরতম প্রকাশের’ নাম হলো আনন্দ।

আনিসুল হক: 

জি।

মনিরুল ইসলাম: তখন আনন্দ ছিল না, ম্যাট্রিক পাস করতে আমাকে তিনবার পরীক্ষা দিতে হয়েছিল।

আনিসুল হক: 

হ্যাঁ, সেটা ভালো তো। আপনি বড় শিল্পী হবেন… একাডেমিক রেজাল্ট ভালো হলে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল ইসলাম এবং মনিরুল ইসলাম হওয়া যাবে না।

মনিরুল ইসলাম: তো এইগুলো নস্টালজিক কতগুলো স্টোরি। টেস্টে গিয়ে হেডমাস্টারকে গিয়ে বললাম—। বিরাট… কিশোরগঞ্জ রামানন্দ হাইস্কুল। স্যার, উনি স্যার উপাধি পেয়েছিলেন ব্রিটিশের কাছ থেকে, ছিমছাম, ওয়েল ড্রেসড, মানে আয়রন করা ড্রেস পরা, লম্বা। উনি প্রথম বললেন, ‘তোর আর্টিস্ট-ই হতে হবে।’ তাঁর মুখ থেকে প্রথম বের হলো।

আনিসুল হক: 

তখন আপনি কোন ক্লাসে পড়েন?

মনিরুল ইসলাম: আমি সেভেনে।

আনিসুল হক: 

দেয়ালপত্রিকায় ছবি এঁকেছিলেন?

মনিরুল ইসলাম: দেয়ালপত্রিকায়, (পত্রিকার নাম ছিল) ‘পড়ুয়ার পুঁথি’।... এটা তো বিরাট এক পাওয়া। রিকশার পেছনে ছবিটা আঁকার পরে একটা লিটারেচার পোয়েট্রি এসবের সুন্দর একটা মাসিক কার্টুন ছিল ওপরে, তারা সিলেক্ট করল। আমি বারবার গিয়ে দেখতাম—কে কী মন্তব্য করছে। এই যে একটা কিউরিওসিটি ভেতরে থাকে। তো কিশোরগঞ্জের লাইফটাই আমার শৈশবকাল। এ জন্য আমাদের এক টিচার ছিল আনারুল হক, ওনার জন্ম উগান্ডায়, তাঁর একই স্টোরি—জন্মের বোধ হয় এক মাস দুই মাস পরে চলে আসে।

আনিসুল হক: 

আপনার জামালপুরে জন্ম, শৈশব–কৈশোর কেটেছে কিশোরগঞ্জে। কিন্তু ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আপনাকে যেতে হলো চাঁদপুরে।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, ওখানে (কিশোরগঞ্জে) ফেল করার পরে চলে আসছি চাঁদপুরে। বাবা চলে এলেন, এর আগে কোনো দিন বাড়িতে আসিনি, চাঁদপুরে। এই ২২ বছর যে ছিলাম ওখানে (কিশোরগঞ্জে)।

আনিসুল হক: 

ওহ, আপনার দাদাবাড়ি চাঁদপুর।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, তাঁদের নিজস্ব বাড়ি আরকি। এখন আর বাড়ি নেই। ডাকাতিয়া নদী নিয়ে গেছে বেশির ভাগ।

আনিসুল হক: 

শৈশব আপনার কাটল কিশোরগঞ্জে, জন্ম জামালপুরে, তিন মাস বয়সে চলে গেলেন। তারপরে আপনার আব্বা?

মনিরুল ইসলাম: স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। মজার কথা হলো এখানে হাশেম ভাই—হাশেম খান—আর্টিস্ট, তাঁর আব্বাও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, নামও এক—ইউসুফ আলী। আমার বাবার নামও ইউসুফ আলী পাটোয়ারী। তারপর সমরজিৎ, আমার সিনিয়র, ওনার বাবাও স্যানিটারি ইন্সপেক্টর। আমি চিন্তা করলাম যে…

আনিসুল হক: 

সব স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের ছেলেরাই কেন আর্টিস্ট হচ্ছেন?

মনিরুল ইসলাম: সেটাই আমার একটা প্রশ্ন। ...তখন এই কাজটা ছিল বাবার, তখন ওই যে এপিডেমিক ছিল—কলেরা, বসন্ত এগুলো চেকআপ করা; তারপর ভেজাল যত রকম আছে। তো পোস্টার আসত কতগুলো। আমার গন্ধটা ভালো লাগত, এই যে প্রেসের একটা নতুন গন্ধ, অদ্ভুত লাগত মানে আনফরগেটেবল। তারপরে ছবিগুলো এত ভালো লাগত—ছবিগুলো...মানে সচরাচর যে ধরনের ছবি হয় নিখুঁত, তা না। ওটার একটা অন্য রকম মজা ছিল। যেমন ‘এই পানি খাবে না’, এখানে এসব বড় বড় নীতিবাক্য দিয়ে পোস্টারগুলো। তখন স্লাইড ছিল কাচের ওপর, কালো স্লাইডে একটা লেয়ার পড়ত, এসব আগের টেকনিক। ক্যামেরা… কালার স্লাইড ছিল না। এসব ভিজ্যুয়াল জিনিস আমাকে ইনফ্লুয়েন্স করেছে। তা ছাড়া নিশ্চয়ই আমার একটা ইনটুইশন ছিল ভেতরে, মানে হাইডিং অর স্লিপিং একটা সিড ছিল, যেটা আমাকে ইম্পোজ করত হাতের কিছু কাজ করতে। এখন সেভেনটি ইয়ার্স ব্যাক, তখন কিশোরগঞ্জে আর্টের কী আর ছিল.. সারা বাংলাদেশে আর্ট হলো সাইনবোর্ড লেখা, রিকশার…

আনিসুল হক: 

সিনেমার বিলবোর্ড?

মনিরুল ইসলাম: সিনেমার বোর্ড তো বড়। আর্ট কলেজে গিয়ে আমি বেশ সারপ্রাইজড হয়েছিলাম, সেখানে দুইটা হল ছিল—রংমহল আর মনিমহল। দাঁড়িয়ে থাকতাম কবে ব্যানারগুলো লাগাবে। মানে এখনো— আই অ্যাপ্রিশিয়েট। ওই যে এখন নাম দিল পপআর্ট, কীভাবে এরা করত এগুলো। এদিকে মানুষের রিয়্যালিটির বাইরে ছবিগুলোতে রং (দেয়া হতো, মানুষের রং) কখনো বেগুনি হয় না, সবুজও হয় না। একেকটা ছবি কীভাবে ম্যানেজ করত এরা? হিউজ! তখন ওরা গ্রাফ করে, প্রজেক্টর ছিল না। ক্যামেরা কী ছিল সুভাষ দত্তের। পরে এসে ওগুলো আমি ডিসকভার করলাম আরকি। তো ওই আর্টগুলা—মানে তারপরে আর্ট কলেজের ইয়া নাম… আছে একজন আর্টিস্ট, হাশেম ভাইদের ব্যাচের। রশিদও বোধ হয় করছে কিছু, আমার মনে নেই তো। তখন তো ছবিটবি বিক্রি হতো না, আর্টিস্ট একটা ফাইন্যান্সিয়াল সাপোর্ট দরকার, সেজন্য একটা...

আনিসুল হক: 

আপনার জন্ম হচ্ছে ১৯৪৩ সালের ১৭ আগস্ট।

মনিরুল ইসলাম: ১৭ আগস্ট। আই ডাউট, তখন তো আমাদের জন্মনিবন্ধনের সার্টিফিকেট ছিল না। কাজেই ঠিক কত তারিখে জন্ম, পাসপোর্টে যখন এটা, হয়তো এদিক হতে পারে…

আনিসুল হক: 

আপনার বয়স কমপক্ষে ৮২ বছর।

মনিরুল ইসলাম: ৮৩ বছর। দ্যাট ইজ মাই পাসপোর্ট এজ। আর বাকিটা সাসপিশন হইতে পারে বা দিস কুড বি রিয়েল।

আনিসুল হক: 

আপনারা কয় ভাই–বোন?

মনিরুল ইসলাম: আমরা নয় ভাই–বোন।

আনিসুল হক: 

আপনি কত নম্বর?

মনিরুল ইসলাম: আমি চার নম্বর। তিনজন ওপরে চলে গেছে। বড় বোন, তারপর আরেক বোন, তারপর বড় ভাই, তারপর আমি। এই সিরিয়ালে তো আমি লাইনে আছি এখন।

আনিসুল হক: 

তারপরে আপনি চাঁদপুর থেকে ম্যাট্রিকটা পাস করে ঢাকায় এসে চারুকলায় ভর্তি হলেন। কলেজ বলত তখন নাকি আর্ট স্কুল?

মনিরুল ইসলাম: তখন গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব ফাইন আর্টস—আর্ট কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস।

মনিরুল ইসলাম: ’৬১–তে। আমি ম্যাট্রিক পাস করলাম চাঁদপুরে। আমার এখন পর্যন্ত কতগুলো…ভাগ্য বলব বা নিয়তি—আমার এক বন্ধু ছিল, আছে এখনো সামসুল ওয়ারেস। ও ব্রিলিয়ান্ট ছিল।

আনিসুল হক: 

সামসুল ওয়ারেস ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের এই একই অনুষ্ঠানে কথা হয়েছে। তিনি বললেন যে আমি এসে ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। আর আপনার কথা বলছে খুবই ভালো ছবি আঁকত। সে গিয়ে আর্ট কলেজে ভর্তি হলো।

মনিরুল ইসলাম: আই হেল্পড। আমি তো আগেই বললাম যে আমার স্টুডেন্ট লাইফ মানে জেনারেল এডুকেশন, মানে জঘন্য ছিল।

আনিসুল হক: 

কিন্তু আর্ট কলেজে পড়া যায় এই আইডিয়াটা ওই যে আপনাকে স্যার উপাধিপ্রাপ্ত উনি বললেন?

মনিরুল ইসলাম: ওনার থেকে একটা অ্যাডভাইস পেয়েছি।

আনিসুল হক: 

কিন্তু এখানে যে ভর্তি হতে হবে, এটা কে বলল?

মনিরুল ইসলাম: এ ছাড়া তো অন্য কিছু ছিল না এবং আমার দ্বারা অন্য কিছু করা সম্ভব না।

আনিসুল হক: 

চাঁদপুরে আপনি এটা জানতেন যে ঢাকায় একটা আর্ট কলেজ আছে?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটা আমি জানতাম। আমার ক্লাসমেট ছিল হাশেম খান ওই যে আর্টিস্ট, তাঁর ছোট ভাই হোসেন। সে মাঝেমধ্যে দেখাত তাঁর ইত্তেফাকের কচিকাঁচার মেলার… ‘সব্বোনাশ…খবরের কাগজে ছবিও ওঠে?’—মানে বিরাট সম্মান। আমি তো দেখছি সাইনবোর্ড আর্টিস্ট, মানে সাইনবোর্ড করে রাস্তার সিগন্যাল। এখন আমি তো ওগুলো লস্ট হয় না মেমোরি, কতগুলো জিনিস হারায়ে গেছে। আই এম সরি। যে সাইনবোর্ডও আর্টও, দিস ইজ আর্ট।
... কাচের পেছনে যে আঁকত অয়েল পেইন্ট দিয়ে।...তারপরে আস্তে আস্তে এল আমাদের যে রিকশা পেইন্টিংগুলো। অপূর্ব ছিল। সেটাকে কথায় বলে, রুরাল আর্ট। তো ওই কোয়ালিটি নষ্ট হয়ে গেছে এখন, ওই ডিজিটাল এসে। মানুষ কিন্তু ওই সময় দিতে চায় না। আসলে এক কথা বলা যায়, সব দিকে থেকেই দরদ চলে গেছে...অ্যানি ফিল্ড। ক্রিয়েটিভ প্রসেস যেগুলো আর্ট—আমি তো করুণা করি, যারা এসব ছবি আঁকত— রুরাল আর্ট, এদের যে চিন্তা—ইনোসেন্ট আর্ট, দ্যাট মিনস, সিংহের কোলে কবুতর বসে আছে, হাতির ওপরে বাঘ বসে আছে—এগুলো একটা ফানি চিন্তা। এগুলো তো আস্তে আস্তে চলে গেছে। ওই কোয়ালিটির কারণে। রিকশার ভেতরটা সুন্দর ছিল, আমিও রিকশার পেছনে ছবি আঁকি স্টুডেন্ট লাইফে। পড়াশোনা বাদে সবই করতাম।

আনিসুল হক: 

তারপর কলেজে এসে আপনার শিক্ষক হিসেবে কাদের পেলেন? জয়নুল আবেদিন স্যারকে?

মনিরুল ইসলাম: আমি পেয়েছি জয়নুল আবেদিনকে। ফার্স্ট দেখা হওয়ার কথা মনে আছে। উনি কিন্তু ক্লাস নিতেন না। উনি আসতেন–যেতেন। ভিজ্যুয়ালি এখনো মনে আছে তাঁর চেহারা। কতগুলো জিনিস আছে না, একদম লাইক আ ফিল্ম। অলিভ কালার একটা হাওয়াই শার্ট, সাদা প্যান্ট, ভক্সওয়াগন একটা জার্মানি থেকে পেয়েছিলেন, ওই যে ওই ট্যুরে। ওনার একটা ইয়া ছিল (ওয়ার্ল্ড টুর স্কলারশিপ)—পৃথিবী ভ্রমণে গেল। টিকিটটা ছিল ঢাকা টু ঢাকা, দ্যাট মিনস ইউ ক্যান গো এনি পার্ট অব দ্য ওয়ার্ল্ড। এইটাতে উনি গিয়ে ছবি আঁকল বিভিন্ন জায়গায় মেক্সিকো, আফগানিস্তান, স্পেন, এই স্কলারশিপে। তো আমি দেখলাম, এখনো মনে আছে সামনে যে এন্ট্রেন্সে গাড়িটা রাখত আইসা…। তখন কিন্তু টিচার না উনি, খালি ওয়াচ করতেন।

আনিসুল হক: 

তখনকার ক্যাম্পাস কোনটা ছিল?

মনিরুল ইসলাম: এটাই।

আনিসুল হক: 

আর্ট কলেজের…বিল্ডিংটা?

মনিরুল ইসলাম: না এইটার আগের। হয়তো আরও ১০ বছর আগে হয়েছে। আমি বলব আর্ট কলেজ, এটা অপূর্ব। পৃথিবীতে আমি তো বহু দেখেছি।...এ রকম ডিজাইনের এত ফ্যান্টাস্টিক মানে এনভায়রনমেন্ট, গাছটাস, আর বিল্ডিং ইটসেলফ—মনে হয় ফ্লোটিং। এই সিঁড়িটার মতো তখন ঢাকায় কোনো সিঁড়ি ছিল না। ওই যে আমরা বলি আবেদিন স্যার আমাদের গুরু—শিল্পগুরু। আর্কিটেকচারের গুরু হলো মাজহারুল ইসলাম। ওনার যে কনসেপ্ট এবং এই দেশে কী ধরনের সব দিকে সাসটেইনেবিলিটি, অনেক কিছু বিবেচনা করে তাঁর বিল্ডিংগুলো। এখন টাইম হয়ে গেছে, এখন আর্কিটেক্ট এটা ইউনিভার্সাল থট নিয়ে অথবা গ্লোবালাইজিং হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। যদিও আমি এটা খুব একটা পক্ষপাতী না। সব গ্লোবালাইজ হলে তাহলে আল্লাহ তাআলা কেন এত ডিফারেন্ট লোক করল, এত ল্যাঙ্গুয়েজ দিল কেন, এত ভেরিয়েশন কেন দিল? সব যদি একই করে, একই ড্রেস পরে, একই খায়। যা–ই হোক এগুলো কথা।

আনিসুল হক: 

জয়নুল আবেদিন স্যার ছাড়া আর কোনো শিক্ষককে মনে পড়ে?

মনিরুল ইসলাম: মনে পড়ে। প্রথম পেলাম আবদুল বাসেত স্যারকে। ভেরি ডিসিপ্লিনড টিচার, ভেরি গুড টিচার। হি লাভড দ্য স্টুডেন্ট...। আমার একটা নস্টালজিক কথা বলি...সামাদকে নিয়ে।

আনিসুল হক: 

হুম।

মনিরুল ইসলাম: স্পেনে আমি চলে গেলাম তো ’৬৯-এ। ১০ বছর পরে এসে দেখি টেলি সামাদ হয়ে গেছে সে।

আনিসুল হক: 

ও টেলি সামাদ আপনাদের সঙ্গে পড়তেন?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, আমার সঙ্গে।

আনিসুল হক: 

আর আপনার বন্ধুবান্ধব আর কারা ছিলেন ওই সময় আর্টিস্ট?

মনিরুল ইসলাম: আমার কেউ নেই আর। সব ডেড। নাসির ইজ আ গুড পেইন্টার। সেও ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল আমার সঙ্গে। বজলু, তারপর সেলিনা হেদায়েত, একটা মেয়ে জীবিত আছে তা–ও একটু ড্যামেজ হয়ে গেছে হিয়ারিং। আর সব চলে গেছে। মানে একমাত্র আমি আছি ওই আমাদের গ্রুপের আরকি। আমি বলি আমাদের টিচার, ... পরে… হি ওয়াজ আ ভেরি গুড পেইন্টার। যদিও ছবি খুব কম এঁকেছেন— আব্দুল বাসেত। এবং তাঁর ছবির কোয়ালিটি…মানে ভ্যালু দিইনি, সক্ষমতা ছিল না তখন। মেমোরিতে এখন স্পষ্ট যে কার কোয়ালিটি অব ওয়ার্ক অব আ পারসন। তারপর মোস্তফা মনোয়ার—আই লার্ন লট অব থিং।

আনিসুল হক: 

উনি আপনার শিক্ষক ছিলেন।

মনিরুল ইসলাম: শিক্ষক। হি ইজ অ্যালাইভ, এখন যাই মাঝেমধ্যে দেখতে। উনি ইন্ডিয়ার গোল্ড মেডেলিস্ট ওয়াটার কালারে।

আনিসুল হক: 

একটু অন্য শিক্ষকদের কাছে বা আলাপে শুনেছিলাম যে জলরঙের নানা ধরনের মাধ্যমে ওনারটা একটা স্টাইল, আবার জয়নুল আবেদিন আরেক রকম, কামরুল হাসান আবার আরেক রকম। এটা আপনি কিছু বলবেন?

মনিরুল ইসলাম: এদের পারসোনালিটিস এটাকে বলে, প্রসেস অব ওয়ার্ক। এটা একেকজনের হাতের লেখা যে রকম, দুই রকম, এক হয় না। আমরা তো শিখি একটা স্টিল লাইফ, একটা বোতল, একটা কমলা দিয়ে, এটা লার্নিং প্রসেস। একটা কাচের বোতল কমলা দিলে, সবুজটা সবুজ থাকে না রিফ্লেক্ট হয়। এই শেখার জন্য আমাদের ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ারে বিগিনিংয়ে পেনসিল কালার টাচ করতে দেয় না। যা–ই হোক এটা প্রসেস একটা। এটা আবেদিন স্যার—একমাত্র আমার ভাগ্য আমি বলব, (আর) কারও হয়নি। বাংলাদেশে আমি পাকিস্তানি আমলে দুবার ছবি এঁকেছি ওনার সঙ্গে। একবার চাঁদপুরে, আবার খুলনায়। তো সেটার অনেক নস্টালজিক স্টোরি। এগুলো ইন্টারেস্টিং। কেন? স্যারকে বলতাম... স্যার, একটু দেখাইয়া দেন। (স্যার বলতেন) ‘আরে মিয়া, ভুইলা গেছি। এগুলো আমি করি না।’ মানে হি অলওয়েজ অ্যাভয়েডেড। তারপর বকাটাও ভালো দিতেন।

আনিসুল হক: 

তারপর আপনি চাঁদপুরে আর খুলনায় তাঁর সঙ্গে তাঁর পাশে…

মনিরুল ইসলাম: ... এতবার ইম্পোজ করছি, এতবার পিছে ঘুরছি একটা দাগ দেওয়ার জন্য। তিনিই একদিন বললেন, মনিরকে ডেকে আনো। রাতের বেলা। আমি বলি, কী ব্যাপার রাতে যেতে হবে? ...বলেছেন, ‘নো কজ’।
তখন তো আমি আর্ট কলেজে ওয়াটার কালার এত করতাম, হাজার হাজার ওয়াটার কালার করতাম।... বাইরে চলে যেতাম রায়ের বাজার। সাইকেলে করে রুটি খেয়ে চলে যেতাম আর্ট কলেজে। মানে নেশার মতো। রাতে মামার বাসায় থাকতাম কাঁঠালবাগান। কারেন্ট খরচ হইত, বকা দিত, তখন কুপি জ্বালাইয়া ওই ফুল ড্রয়িং করা, কুকুর…রাতে...স্কেচ আছে আমার এগুলো এখনো। ...এগুলো পেনসিল ড্রয়িং। তারপরে থার্ড ইয়ারে হোস্টেল ছিল না। আর্ট কলেজ হোস্টেলটা হইল যখন আমি থার্ড ইয়ারে গেলাম; থার্ড ইয়ারে নিউমার্কেটের পেছনে ছিল। সেখানে আবার আমাদের টিচার কিবরিয়া স্যার, সমরদা সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন, ওপেন ছিলের একদম। ওই আর্ট কলেজে এখন তো ওটা চেনা যায় না। এত বিল্ডিং!
গোরস্তানটা ছিল একদম ওপেন। ওনারা বসে থাকতের ঘণ্টার পর ঘণ্টার ওপরে। মানে কী দেখতেন যে…তখন কিন্তু ডেডবডি আসত, ওগুলো দেখা যেত। ... আবেদিন স্যার খুব ভ্যালু দিতেন কিবরিয়া স্যারকে।

আনিসুল হক: 

পরে তো উনি বিদেশে গিয়েছিলেন।

মনিরুল ইসলাম: না, তিনি একটা স্কলারশিপ নিয়ে জাপানে। সেটা তো শর্ট টাইমের জন্য। আমি ওনারে বলি, হি ইজ ইনোসেন্ট। ছবিটা তো মেডিটেটিভ ব্যাপার টোটালি। ওনার যে ছবির সাবজেক্ট, পারসোনালিটি, ডিপার সেন্স, এটা কিন্তু একটা স্পিরিচুয়াল ইয়ে চলে আসে। ছবি একটা অথেনটিক রিয়েল থট নিয়ে তৈরি হয়, মানে যেটাতে পিউরিটি থাকে, মানুষ কিন্তু—আমি জানি না, তবে এটা আমার ইন্টারপ্রিটেশন—ওই ছবি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখে। একটা ম্যাগনেটিক কিছু আসে, ম্যাজিক্যাল টাচ থাকে। না হলে ছবি তো বোরিং।

আনিসুল হক: 

আমাদের সম্পাদক মতিউর রহমানের কিবরিয়া স্যারের অনেক কালেকশন আছে। অনেক সময় প্রথম আলোর দেয়ালে সুন্দর সুন্দর পেইন্টিং থাকে। আমি তাকিয়েই থাকি, তাকিয়েই থাকি; একটা প্রশান্তি হয়। তো কামরুল হাসান সম্পর্কে আপনার কোনো স্মৃতি আছে?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। আমার তো আসলে অনেক ল্যাকিংস তৈরি হয়ে গেছে ইন্ডাস্ট্রিতে। আমি তো ১০ বছর পরে এলাম। আর্ট কলেজে তিন বছর আমি টিচার ছিলাম তখন। তারপর আকস্মিক স্পেনে যাওয়া, সেটা একটা সুন্দর স্টোরি, আমি বলছি...। আমি ওই আর্ট কলেজ টিচিংয়ের বাইরে লাইফে কখনো পাকিস্তানেও যাইনি, ইন্ডিয়াতেও যাইনি—নেভার। এই যে স্পেনে যাওয়া যাবে, ইট ইজ ভেরি ডিফিকাল্ট; কারণ, আমি দেখতাম, আমার যাওয়াটা হলো নবী ভাইয়ের (রফিকুন নবী) কারণে...উনি আমার এক বছর আগে ঢুকেছেন, আমি এক বছর পরে। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ার। করিডর এন্ট্রান্সে ক্রস করেছি, ’৬৯–এ অলরেডি যুদ্ধ লেগে গেছে...মানে এটার আবহাওয়া, বোথ ইস্ট পাকিস্তান-ওয়েস্ট পাকিস্তান কিন্তু কোনো যোগাযোগ নেই আর।

আনিসুল হক: 

’৬৯–এ গণ–অভ্যুত্থান হয়েছে।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। তো নবী ভাই বললেন, যাবা নাকি স্পেনে? আমি বললাম, আপনি যান না কেন? মানে এটা একটা অদ্ভুত! উনি এভাবে বললেন, স্কলারশিপ কেউ ছেড়ে দেয় নাকি? দেখো না ওই খাজা সাহেব (আরেকজন অধ্যাপক) ১৫ বছর ধরে খালি ফরম ফিলআপ করতেছে।
...তো এগুলো আমি এখন অনেক চিন্তা করি আরকি... যে লাইফটাই ডেস্টিনি, হিউম্যান ডেস্টিনি কিছু একটা আছে মানুষের।

আনিসুল হক: 

নিশ্চয়ই। এটা আইনস্টাইন বলতেন, সবকিছু আগে থেকে ঠিক করা আছে।

মনিরুল ইসলাম: সেটা আমিও চিন্তা করি। তারপর তো ২০০ টাকা বেতন তখন আমার। ৪ হাজার টাকা আসা–যাওয়া স্পেনে, ৯ মাসের জন্য স্কলারশিপ। স্কলারশিপটা ছিল একটা ইন্টারচেঞ্জ—স্প্যানিশ একজন লোক পাকিস্তানে আসবে, পাকিস্তানের একজন স্পেনে যাবে। থ্রু মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যান্ড কালচারাল অ্যাফেয়ার্স। এটার জন্য মেরিটের কোনো দরকার নেই, দে ক্যান সেন্ড অ্যানিবডি। তারপর আমি ডিরেক্ট চলে গেলাম। যুদ্ধ আরম্ভ হয়ে গেল... মানে খবরের কাগজ কিনতাম। আরেকজন ছিলেন অ্যাটমিক এনার্জির...পেপার নিয়ে আসতেন যুদ্ধের সময়।

আনিসুল হক: 

তখন কি মাদ্রিদে?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, সেই মাদ্রিদে হোস্টেলে ছিলাম। সিক্সটি ডিফারেন্ট ন্যাশনালিটিজ অল স্কলারশিপ হোল্ডার। আফ্রিকান, আমেরিকান, হাইতি, অল ফরেনার, মিক্সড টোটাল। এটা ফ্রাঙ্কোর টাইমে। সেই ফ্রাঙ্কো, একজন ডিক্টেটর ছিল—হিটলারের বিরাট বন্ধু। কিন্তু তার কতগুলো জিনিস, মানুষের তো দুইটা পিঠ থাকে...

আনিসুল হক: 

প্রত্যেক মানুষের মধ্যে ভালো–খারাপ থাকে।

মনিরুল ইসলাম: ভালো–খারাপ থাকে। ফ্রাঙ্কোর সিভিল ওয়ারটা কিন্তু খুব হাইলি ফোকাসড ওয়ার্ল্ডওয়াইড। স্পেনের রিপাবলিকান আর ফ্রাঙ্কোর পার্টি যুদ্ধ হয়েছে। অনেক বিদেশি মারা গেছে। তারপর ফ্রাঙ্কো জিতল। সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে কিন্তু ফ্রাঙ্কোকে হিটলার বলল, ‘আমারে যেতে দাও খালি মরক্কোতে’। ফ্রাঙ্কো বলল, ‘নো।’ হি ওয়াজ শকড। কারণ, বন্ধু। ফ্রাঙ্কো যেতে দিলে তো স্পেন ইনভলভড হয়ে যেত সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারে। ঠিক তিন বছর আগেই স্পেন সিভিল ওয়ার থেকে এল। ইট ওয়াজ মোর লাইক বাংলাদেশ দ্যাট টাইম, মানে ইস্ট পাকিস্তান। স্পেনে আস্তে আস্তে ডেমোক্রেসি দেখলাম—কিং এল, কনটারলস কমিউনিস্ট পার্টি ওপেন করে দিল। পুলিশ বসা থাকত, মানে হাইলি দে হ্যাভ বিন টরচার্ড পিপল। ইউনিভার্সিটি ক্লাসরুমে বসা থাকে পুলিশ। কিছু ইয়া করতে দেখলে অ্যারেস্ট করত। তো আমি এসব ট্রানজিশন দেখলাম।

আনিসুল হক: 

আপনার এই যে ৯ মাসের স্কলারশিপ বা এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম, সেটাতে আপনি থেকে গেলেন?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, আমি বলি। আমরা যে হোস্টেলে থাকতাম, সেখানে ডিপ্লোমেটিক ক্যারিয়ার স্টুডেন্টরা পড়ত, সেখানে মিনিস্ট্রি অব ফরেন আর্টস থেকে কতগুলো লোক আসত; এ জন্য আমি বেশির ভাগ অ্যাম্বাসেডরকে চিনি। এখন কেউ রিটায়ার্ড হয়ে গেছেন, কেউ রাজার সেক্রেটারি, বেশির ভাগ আমি চিনি তাঁদের...বিলগ্যামি একজন অ্যাম্বাসেডর ছিলের। তিনি একদিন দাওয়াত করে হরিবল প্রোপাগান্ডাস্টিক একটা ফিল্ম দেখালেন।...ওয়েস্ট পাকিস্তানের প্রোপাগান্ডাস্টিক ফিল্ম। ফিল্মটা দেখে আমার এত খারাপ লাগল যে...।

আনিসুল হক: 

আপনি পড়তে গেলেন ৯ মাসের জন্য, পরে সেখানে থেকে গেলেন। তারপর আপনি ওখানে পড়াশোনা করলেন কোথায়?

মনিরুল ইসলাম: আমি পড়াশোনা করেছি বলতে, আমি মাদ্রিদে ছিলাম। একটা হোস্টেল ছিল।...কালচারাল যারা আসত, একটা হোস্টেলে—ভেরি ওল্ড বিল্ডিং,  সেখানে আমরা থাকতাম আরকি। যাহোক, আমার স্কলারশিপ চলে গেল। ...তখন সামার, মিনিস্ট্রিতে গিয়ে স্কলারশিপের যারা বন্ধু হয়ে গেছে...যাহোক, আমি গেলাম...আমাকে বলছে, ‘নো মোর বাংলাদেশি পাকিস্তানি, আর স্কলারশিপ দিয়ো না ইনডিপেনডেন্স।’... সেটাই লাস্ট টাইম বন্ধ করে দিল, এই আমার লাইফ আর হলো প্রফেশনাল... এটা আমার মনে হলো এখন সাপে বর...।

আনিসুল হক: 

কিন্তু আপনি তো ছাত্রাবস্থা থেকে এখনো খুব ভালো রিয়েলিস্টিক ড্রয়িং করতে পারেন। কিন্তু আপনি গেলেন...

মনিরুল ইসলাম: আমি আমার সেলফ পোর্ট্রেটটা করছি। এগুলো দিয়ে দেব তোমাকে। ওটা আছে। লোকে আমাকে বলে, ‘...কিছুই বুঝি না কী করেন।’ আমি বলি, আমিও বুঝি না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর আমার বলতে হয় ইজি ওয়েতে, ঘোরপ্যাঁচে না গিয়ে বলি—আমি গোলাপ না এঁকে গোলাপের গন্ধ আঁকি। দেন হি আন্ডারস্ট্যান্ডস। এটা অন্যভাবে বোঝালে, মানে ইন্টেলেক্ট ওয়েতে বা লিটারারি ওয়ার্ল্ডে অনেক ঘোরপ্যাঁচ দিতে হতো।

আনিসুল হক: 

এটা নিয়ে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের একটা কথা আছে। লোকে বলে কবিতা বুঝি না। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘ফুল শুঁকিয়া যদি কেহ বলে কিছুই বুঝিলাম না, এই কথার যেমন কোন অর্থ হয় না। কবিতা পড়িয়া যখন কেহ বলে কিছুই বুঝিলাম না। এই কথারও কোন অর্থ হয় না।’

মনিরুল ইসলাম: জিনিস একই।

আনিসুল হক: 

তারপর আপনি যে স্পেনের নাগরিকত্ব পেলেন, স্পেনে আপনার দুটি বড় জাতীয় পুরস্কার আছে। পুরস্কার দুটির নাম কী?

মনিরুল ইসলাম: পুরস্কার তো না।

আনিসুল হক: 

স্বীকৃতি।

মনিরুল ইসলাম: স্বীকৃতি। একটু বলি, প্রতিটা কান্ট্রি কিন্তু তার নিজ দেশকে প্রমোট করে। ফ্রেঞ্চ অলওয়েজ উইল গো ফর ফ্রেঞ্চ আর্টিস্ট। যখন একটা বিদেশি আর্টিস্ট সোশ্যালিস্ট কোয়েভা, অরফ্যাড ল্যান্ড, কিউবান—যখন ওদের পাস হয়ে যায় কাজের কোয়ালিটি, তখন স্বীকৃতি থামাতে পারে না। আমার একই পর্যায়ে...আমাকে কাজ করতে হয়েছে, আই হ্যাড টু স্ট্রাগল। অনেক কাজ করতে হয়েছে, আমার বোঝাতে হয়েছে আমি তোমাদের চেয়ে অনেক ভালো। আমি বললে তো হবে না। অসংখ্য কাজ করেছি আমি। বেশ করপোরেট এরিয়া কোম্পানি, ব্যাংক–ট্যাংক—এগুলো। তারপর কম্পিটিশনে ওয়ার্ল্ডওয়াইড।

আনিসুল হক: 

আপনার এচিংয়ে ওয়াটার কালারের ইফেক্টের কথা বলে লোকে...

মনিরুল ইসলাম:  বলে ‘স্কোয়েলারা মনির’। দ্যাট মিনস, স্কুল অব মনির। আমি তো ওয়ার্কশপ দিয়েছি মিউজিয়ামে, ওই প্রত্যন্ত গ্রামে, যেখানে জন্মস্থান। আমি কিন্তু শেখাই সব, এভরিথিং আই নো। অনেকে কিন্তু শেখাতে চায় না। বলে যে এটা আমার পারসোনাল...ইটস টোটালি রং। মানে এটা হলো নিম্ন ক্লাসের। বলি, তোমারটা কেউ নেবে না, তুমি তোমারটাই করবা। ওদের যত শেখাও, ওরা ওদেরটা করবে।

আনিসুল হক: 

আপনার ওই পুরস্কার দুটির কথা একটু শুনতে চাইছি।

মনিরুল ইসলাম: পুরস্কার, এগুলো স্লো প্রসেস। আমাকে যে কাজ করতে হয়েছে, আমি প্রথম ঢুকেছি একজন প্রিন্টার হিসেবে। ওই পান্ডি, ফিলিপিন, সে একটা কোম্পানিতে কাজ করত মাদ্রিদে। কোনো ওয়ার্কশপ ছিল না। গ্রাফিকসের ফার্স্ট ওয়ার্কশপ। সেখানে সে কিছুদিন কাজ করে প্যারিসে চলে যাবে। আমাকে বলল, ‘মনির, কাজ করবা নাকি?’ বললাম, ‘হ্যাঁ কাজ করব। দাও তো।’ বলল, ‘পয়সা নেই। কি, করবা? কাজটা হলো, অন্য আর্টিস্টের ছবি ছাপানো, প্রিন্টারে। ঠিক আছে?’ আমি বললাম, গ্রেট। করলাম। ...এটাই আমাকে ইম্পোজ করেছে ওয়ার্ক টুগেদার, মানে ভেরি নোন আর্টিস্ট... বিকজ অব স্প্যানিশ আর্টিস্ট কনটেম্পোরারি আর্টিস্ট বাইরের ইভেন...

আনিসুল হক: 

ছাপানো মানে প্রিন্ট করা?

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, ছাপানো। এটা ওরা তো আর্টিস্ট জলরং করে, কোনো দিন প্রিন্ট করেনি। টেকনিক্যাল জিনিসটা দেখাতে হতো আমার। ... কীভাবে করে, এটার একটা মেকানিক্যাল প্রসেস আছে ওখানে। তখন ওই ওয়ার্কশপটা ছিল ইন্টারন্যাশনালি খুব বিখ্যাত। বিখ্যাত বিখ্যাত আর্টিস্ট আসত। তো ওরা কোনো দিন প্রিন্ট করেনি, এচিং সম্পর্কে জানে না।

আনিসুল হক: 

তো ওদের এই কাজগুলো করতে করতে আপনার লাভ হলো।

মনিরুল ইসলাম: লাভ মিনস দুইটা জিনিস—একটা ওরা আমারে সম্মান করত, প্রিন্টার ভাবত না। আমি তো ছবি আঁকি। তো ওদের সঙ্গে লাঞ্চ করতাম দুপুরে, কথা বলতাম; শুনতাম তাদের কথা। এই যে একটা কারেজ, এই মাপের আর্টিস্ট। আবেদিন স্যার একটা কথা বলছিলেন যাওয়ার সময়, ‘মনির, যাইতেসো তো স্পেইনে, ল্যাংড়ার পিছে দৌড়াইও না। চ্যাম্পিয়ন দেইখা দৌড়াইও।’ এই ল্যাঙ্গুয়েজে তো উনি কথা বলতেন। আমি ভাবলাম, না, ঠিকই তো বলেছেন। দ্যাট মিনস, ইফ ইউ ওয়ান্ট টু নো—তুমি যদি জানতে চাও—ভালো, বেস্ট আর্টিস্ট খোঁজো। তার হেলপার হয়ে কাজ করলেও ইউ আর বেনিফিটেড। ল্যাংড়ার পিছে তুমি ঘুরলে আরও খোঁড়া হয়ে যাবা।
আনিসুল হক: বড় আর্টিস্টদের সঙ্গে কাজ করলেন, আপনার সাহস হলো…
মনিরুল ইসলাম: খাইতাম, যাইতাম, ইন্টারেক্টিং করতাম—কথাবার্তা, ফ্রেন্ডশিপ—তাদের স্টুডিওতে যাইতাম। এই যে একটা কারেজ, এটা তো একটা কমপ্লেক্স থাকে, স্টুডেন্ট থাকলে আমরা কোনো সময় আর্টিস্টদের—বড় আর্টিস্টদের কাছে ভয়ে যাইতে হয় একটু। কী মনে করে না করে!

আনিসুল হক: 

আচ্ছা, এখন আপনি যে ‘ক্রস অব অফিসার অব দ্য অর্ডার অব কুইন ইসাবেলা’, এটা ২০১০ সালে পেলেন। ‘কমান্ডার স্প্যানিশ অর্ডার অব মেরিট’ পেলেন ২০১৮ সালে।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। এটা মানে, ফার্স্টে আমার কতগুলো অ্যাওয়ার্ড আছে, আমি অ্যাড করি না এগুলো। যুগোস্লাভিয়ার যে প্রিন্ট মিনারের, ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট যুগোস্লাভিয়ার। আরেকটা ড্রয়িং, রিজেকাতে। তারপর নরওয়েতে দুবার আমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। তারপর আমি জুরি হয়ে যাই, যেখানে অ্যাওয়ার্ড পাই, সেখানে দে ইনভাইট অ্যাজ আ জুরিবোর্ড, তো ওইটা একটা। আরেকবার এ অ্যাওয়ার্ড দুইবার পেলে এটা ওয়ার্ল্ডওয়াইড ক্যাটালগড। যেখানেই হোক, ইনভাইট করবে। তো ওটা আস্তে আস্তে স্লো প্রসেসে যাওয়ার পর তারপর যে ওয়ার্ল্ডওয়াইড এই প্রাইজগুলা, যে সিভিল অ্যাওয়ার্ড, যেমন ২১ পদক সিভিল অ্যাওয়ার্ড এটা। ‘অর্ডার অব দ্য অফিসার’ আমি জানতামও না...সেটা আমার কিংয়ের হাত থেকে নিতে হতো। ...আরতুরো ফার্স্ট অ্যাম্বাসেডর...স্টিল হি ইজ ভেরি গুড ফ্রেন্ড অব মাইন। আরতুরো স্প্যানিশে বললেন, ‘মনির, হাউ ইউ গট দিস অ্যাওয়ার্ড?’ আমি বললাম, ‘আমি জানি না।’ ওরা তো ইনভেস্টিগেট করে এটা, ওয়ার্ল্ডওয়াইড যারা কলাবরেট আছে কালচারালি বিভিন্ন সাইডে।
আমার তো আর কিছু নাই। আর্টের এই যে ল্যাঙ্গুয়েজটা, এচিং ল্যাঙ্গুয়েজটা, এখন অনেকে এটা ওয়াটার কালারের মতো করে। কারণ, আই থিঙ্ক, সাবজেক্টটা হচ্ছে খুব কাঠখোট্টা। সলিড ফর্ম, সলিড। এই যে সফটনেসটা, এটা অনেকে মনে করে, এই যে ছবিটা, এটার যে সফটনেস, এটা ওয়াটার কালার দিতে পারব।
আই নেভার ইউজ ওয়াটার কালার। এটার জন্য আমার টাইম দিতে হয়েছে, আস্তে আস্তে শিখতে হয়েছে। অ্যাসিডকে মনে করি কালো রং, পানিটাকে অ্যাসিডের পানি মনে করি। তখন এটার পানি মেশাতে হয়; তারপর প্লেটে কতটুকু পরিমাণে রাখতে হয়, এটা টেকনিক্যাল ব্যাপার।
হ্যাঁ, সেটা করতে করতে যেকোনো চকের একটা দাগ এক রকম, চারকোলের দাগ এক রকম, একটা পেনের দাগ—অল আই ক্যান ডমিনেট। এখন কোনটা কীভাবে কাগজে প্লেটটা করতে হবে, এটার এক্সপেরিয়েন্স তো আমার ফোর্টি ইয়ার্সের। এখনো বাকি আছে।

আনিসুল হক: 

এখনো বাকি আছে। এখন বলেন, বিয়ে করলেন কত সালে?

মনিরুল ইসলাম: ’৮৪–তে।

আনিসুল হক: 

তখন আপনার ৪১ বছর বয়স। যাঁকে বিয়ে করলেন, তিনিও এচিং আর্টিস্ট।

মনিরুল ইসলাম: আর্টিস্ট। তারপরে সে পেইন্টিং করত। আমরা তো এচিং আর্টিস্ট, একটা মিডিয়ায় যখন কাজ করি, এচিংটা একটু ডেঞ্জারাস আমার কাছে। এত বছর কাজ করার পর এটা এখান থেকে সরতে দেয় না। একটা কাজ তো টাইম লাগে, এর মধ্যে অন্য ইমেজ আসে।

প্রথম আলো: 

আনিসুল হক: ওনার নাম কী ছিল?

মনিরুল ইসলাম: কারমেন ফেরারে। কিন্তু ডাকনাম মেলা।

আনিসুল হক: 

মেলা? আপনাদের একটা ছেলে আছে।

মনিরুল ইসলাম: আমার একটা ছেলে। আরমান ইসলাম ফেরেরে। সে আবার টেনিস কোচ ছিল।

আনিসুল হক: 

তারপর আবার তাঁর সঙ্গে আপনার বিচ্ছেদও ঘটে গেল।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ, বিচ্ছেদ। শোনো, ইউরোপে এখন এটা ফান হতে পারে, ইয়েও হতে পারে। এভরিথিং ইজ ... মানে ডেট এক্সপায়ার হয়ে গেছে, ওষুধের মতো।

আনিসুল হক: 

বিয়েও এক্সপায়ার হয়ে যায়।

মনিরুল ইসলাম: হয়ে যায়। তারপর আমরা বসলাম একসঙ্গে। উই টক ডিরেক্টলি। শি ওয়ান্টস টু (স্টে অ্যাপার্ট), আলাদা হয়ে যাবে। আমি বললাম, ঠিক আছে, আমার কোনো আপত্তি নেই। প্রপোজ করছে।
তারপর আমি স্টুডিও করে দিলাম। ...যেহেতু আই হ্যাভ আ সান।

আনিসুল হক: 

ঠিক আছে। এটা কত সালে হলো মনে নাই?

মনিরুল ইসলাম: ডিভোর্স? ওইটা সাত বা আট বছর—এ রকম।

আনিসুল হক: 

আচ্ছা।

মনিরুল ইসলাম: যা–ই হোক। ওইটা এগ্রেসিভ কিছু হয়নি। স্টিল শি ইজ মাই ফ্রেন্ড। যখন আমি যাই, কল করি। শি কামস, হাভ লাঞ্চ উইথ মি। এগুলা তো একটু ইয়ে বেশি, আমরা একটু অন্যভাবে দেখি। ডার্টি র‍্যাগ আসে অনেক। এটা সুন্দরভাবে…একটা সম্পর্ক ম্যান অ্যান্ড ওম্যানের যখন হয়, অনেক কিছু নিয়ে যায়, হাইডিং স্টোরিজ ফ্রম বোথ। সেখানে ছেলেপেলে থাকলে অ্যাগ্রেশন কোনো দরকার নাই। হ্যান্ডেল ইট নাইসলি। আই ভ্যালু ফ্রেন্ডশিপ, ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। দুনিয়াটা এখন একটা যুগ আসছে, সেটা একটা ফাস্ট…এভরিথিং ওয়ান্টস টু গেট ফাস্টলি। সেকেন্ডলি, আস্তে আস্তে ওপেন হচ্ছে আরকি।

আনিসুল হক: 

স্পেনে আপনি তো অনেক উচ্চমূল্য পেয়েছেন। অনেক বড় পুরস্কার পেয়েছেন। ছবি বিক্রি হতো। তারপর আপনি স্পেন থেকে বাংলাদেশে আসলেন মোটামুটি নব্বইয়ের দশকে।

মনিরুল ইসলাম: না, আমি তো সব সময় কন্ট্যাক্ট রেখেছি। দিস ইজ মাই কান্ট্রি এবং আমার ছবিতে স্পেস অন দেখা যায় ...এটাই কিন্তু ইনফ্লুয়েন্স অব মেঘনা। ভাস্ট ল্যান্ড, তার গ্লোয়িং আলো—সব ছবি। একজন বলে, আপনি তো একটু অন্য স্তরে চলে গেছেন। কারণ, সাদা যখন আসে বেশি ছবিতে, মানে এটাকে মিনিমালিজম বলে। সব বাদ দিতে দিতে একটা লাইন ড্রপ। কিন্তু সেটার জন্য আমার আশি বছর পড়তে হয়েছে—লাইনটা কোথায় দেব, ড্রপটা কোথায় দেব!

আনিসুল হক: 

মেঘনার একটা বিপুল জলরাশির মধ্যে।

মনিরুল ইসলাম: এটা কিশোরগঞ্জেও। নরসুন্দা নদী ছিল। অনেক স্টোরি জড়িত। এই যে মানুষ যেখানে নদী থাকে, তার যে কত অনুভূতি এই নদীর প্রতি। লাইফও একই। নদীর যে বাঁক আসে, যেভাবে নদী যখন নামে, পাথর ইয়া সরিয়ে ফেলে...এরপর মাঝখানে এসে এটা বড় একটা আকৃতি নেয়। কিন্তু কারেন্ট ঠিকই থাকে নিচে। ...লাইফেও হিউম্যান সেম। এর কোনো ইয়া নাই। ওভাবে দেখলে জিনিসগুলো একই জিনিস।

আনিসুল হক: 

তো নদী আপনার ছবিতে প্রভাব ফেলেছে? নারী ফেলে নাই?

মনিরুল ইসলাম: অবশ্যই। লাভ—আমি বলছি লাভ। বিভিন্ন ধরনের লাভ হতে পারে। আমি দেখছি... অনেক মানুষ মরক্কোতে গিয়ে, একটা লোক ডেজার্টে একটা শুকনা ড্রাই স্টোন দিয়ে...তাঁকে এখান থেকে আনা যাবে না। হি ইজ হ্যাপি উইথ দিস স্টোন। তারপর হয়তো বারে হাফ ড্রাংক হয়ে বিয়ার খাচ্ছে, হি ইজ হ্যাপি উইথ দ্য বিয়ার। মানুষের যে লাভ, বিশেষ করে হিউম্যানদের... এখন তো দরকার। ...অবসেশন, অ্যাম্বিশন সবারই আছে। বেশি হয়ে গেলে অবসেসিভ হয়ে গেলে, দেন ইউ সে ইট রং। মানি অ্যান্ড ফেইম, এভরিবডি ইজ রানিং ফর দিস। কিন্তু একটা লিমিটের বাইরে গেলে সাসপিসাস। ...কন্ট্রোল না থাকলে আমরা চোখের সামনে কত দেখতেছি, পাওয়ারফুল লোকেরা কেমনে চলে গেল একদম। ডে অ্যান্ড নাইট ইন হেল। তো এর ভেতরেই, মানে আমি বলব, আই অ্যাম প্রাউড টু বি বাংলাদেশি। আমি তো কন্টাক্ট রেখেছি সব সময়। ১০ বছর পর আসলাম। তারপর প্রতিবছর আইসা আমি এক্সিবিশন করতাম ফয়েজ ভাইয়ের গ্যালারিতে, শিল্পাঙ্গনে।
তবে এর ভেতর আমাদের একটা লাইফ আছে। ছবি আঁকা তো খালি বিজনেস না যে আয় করে গেলাম, টাকা নিয়ে চলে গেলাম। না, এর ভেতরে যে কত বড় লোক চলে গেছে, দে হ্যাভ ক্যারেক্টার। ফয়েজ ভাইয়ের যেমন একটা ক্যারেক্টার ছিল। মানে এসব লোক…মুর্তজা বশীর একটা ক্যারেক্টারওয়ালা লোক। মানে, এসব লোক নেই এখন।
আর্টটা খালি ছবি আঁকা না, আর্ট অব এথিক অ্যান্ড এস্থেটিক। আবেদিন স্যার বলেছেন, আমাদের সবচেয়ে বাংলাদেশে যেটা দরকার, এটা নাই আমাদের—এথিক অ্যান্ড এস্থেটিক—দুইটা জিনিস। মানুষ এখনো ওইভাবে…নোংরা তো আসলে আমি বলি। এই যে বিদেশে যায়, লুঙ্গি পরে ধোয় না, কাপড়টাপড় ধোয় না, তা–ও চলতেসে সে।

আনিসুল হক: 

বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবতই একটু নোংরা। আপনি ঠিকই বলছেন। এটা জীবনযাপনে যেমন আমরা নোংরা, আমাদের কথাবার্তা, চালচলন, আচরণের মধ্যেও সৌন্দর্যের…

মনিরুল ইসলাম: তা ছাড়া হয়ে গেছে একটু। এয়ারপোর্ট থেকে নামলেই মানুষগুলো যে খাপ ধরে রাখছে সব। সব একটা সাসপিশাস। ফেস একটা অন্য রকম ইয়া আরকি। কমফোর্ট না। পার্শ্ববর্তী দেশ কত জেন্টেল। ভুটানে গেলাম, কী তাদের বিহেভ! হাউ ইট ইজ? তাদের কি আল্লাহ এসে শিখাইছে? নো! তো বললাম, ভুটান, নেপাল—এসব কান্ট্রি ভদ্র।
তারপর আমি বলব যে বাংলাদেশে আমি এসে কাজ আরম্ভ করলাম। এসেছিলাম তিন মাসের জন্য। ছয় বছর পরে গেলাম আমি। দ্যাট মিনস…

আনিসুল হক: 

তিন মাসের জন্য এসে ছয় বছর থাকলেন? এটা কত সালে আসছিলেন মনে নাই না?

মনিরুল ইসলাম: নাই। করোনার আগে। করোনার এক বছর আগে। তো আমি এই যে কাজ বাড়াইতেছি, বাড়াইতেছি কাজ।

আনিসুল হক: 

এখন আপনি তো হাজার হাজার ছবি এঁকে ফেলেছেন।

মনিরুল ইসলাম: দেখা যায়, কিন্তু ছবি শেষ হয় না—নেভার। এক ছবি ২০ বছর আঁকতে হবে।

আনিসুল হক: 

যেমন আপনি বইয়ে আঁকছেন, পত্রিকার পাতায় আঁকছেন—এমনকি টালি খাতার মধ্যেও…

মনিরুল ইসলাম: টালি খাতা আছে। তারপরে...

আনিসুল হক: 

টালি খাতা—এমনকি ক্যালেন্ডারের পাতা।

মনিরুল ইসলাম: আমার সবচেয়ে ভালো ইন্টারেস্টিং স্টোরি বলি। ফ্রিজ কিনলাম একটা আর্কিটেক্টকে নিয়ে। ডিসকাউন্টে ৮৪ হাজার, টেন ইয়ার্স ব্যাক। তো ওইটার যে কাভার আছে, বড় কার্ডবোর্ডের। দ্যাট আই সোল্ড টুয়েলভ লাখস, কাভারটা। তো সেটা আর্কিটেক্ট কয়জন এসে বলে, ‘মনির ভাই, আপনারে চারটা ফ্রিজ কিনে দিই। আপনি ফ্রিজ রাখেন।’ মানে, এগুলা কতগুলা নস্টালজিক; মানে, ইন্টারেস্টিং; মানে, সাউন্ডস।

আনিসুল হক: 

আপনি এই যে বলছিলেন যে আর্টিস্টকে নতুনের অন্বেষণ করতে হয়। একই ছবি আঁকলে সেটাকে প্রস্টিটিউট আর্ট, ফ্যাক্টরি আর্ট...

মনিরুল ইসলাম: ইউরোপে বলে আরকি এগুলো। বলতে খারাপ লাগে প্রস্টিটিউজম আর্ট, করাপটেড আর্ট, তারপর ফ্যাক্টরি টাইপের আর্ট, বাট ক্রিয়েটিভিটি ইজ ডিফারেন্ট। বাট ক্রিয়েটিভিটি ইজ ডিফরেন্ট, এটা চ্যালেঞ্জিং। এটা আসছে একটা ল্যাটিন আমেরিকার রাইটারের লেখায় পড়েছিলাম আমি—অভ্যাসটা হলো একধরনের মৃত্যু, উইদাউট নোয়িং ইয়োর পার্ট অব বডি ইজ ডাইয়িং। দ্যাট মিনস, শেওলা জমে। একই জিনিস, একই একটা ফর্মে পড়ে গেছি। রাস্তাও এক, খাওয়াও এক, টেবিলও এক—এভরিথিং। এই যে লিমিটেড হচ্ছে আস্তে আস্তে। তারপর ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট নিউ ফ্রেন্ড, নতুন বন্ধু দরকার নাই। রাস্তা তো আছে আমার, আবার রাস্তার দরকার কী? এই লিমিটেশন আর্টের ব্যাপারে আমি পারসোনালি চিন্তা করলাম যে আমি যা করি, সেটা তো জানি আমি, খুব একটা ভেরিয়েশন হবে না। আমার জানার বাইরে কী করতে পারি? ছবি আঁকার মাধ্যমে আমি কোনো রকম সারপ্রাইজ পাই কি না। নতুন কিছু ঘটতেছে কি না। সেটার জন্য আমার দরকার…দিস ইজ আ মেডিটেটিভ ওয়ার্ক। না হলে তো আমি যার খোঁজ দিছি, একই জিনিস আসবে। একটা কথায় আছে না, ‘নো ডেসট্রাকশন নো ক্রিয়েশন’। তুমি যদি ধ্বংস না করতে পারো, ক্রিয়েট করতে পারবা না।
...কাহলিল জিবরান, আর্টিস্ট প্লাস রাইটার ফিলোসফার—লেবাননের। সে তার ছবি অনেক পুড়িয়েছে। এই জন্য ডেসট্রাকশনটা ক্রিয়েশন হওয়ার জন্য। আবার জানতে হবে, আমি ডেসট্রাকশনটা একটা চারাগাছ—যদি আমি এটার ইয়া না দেখি, ফল দেয় কি না, তখন কেটে ফেলি, তাহলে ইটস নট...সুতরাং এই যে একটা সিম্পল ফিলোসফি, যে ছবি কোনো দিন শেষ হয় না। এটার মানে কী? ছবি আনফিনিশড। হোয়াট ইজ আনফিনিশড? এটা মানুষ হয় কি…আমার কাছে কিন্তু ভালো লাগে আনফিনিশড ছবি। এটার একটা অন্য রকম ব্রিডিং আছে। কমপ্লিট ছবি কোনটা? আমরা কিন্তু গরমমসলাদার। ইউরোপিয়ানরা আমাদের আর্টকে বলে ‘কারি পেইন্টিং’। মানে, এটার যে ইকোসিস্টেমের কজ আছে, আমরা স্পাইস খাই কেন? এই যে বিষুবরেখা গেছে, ইকুয়েডর, মেক্সিকো, ইন্ডিয়াতে এগুলা টাচ করেছে। এরা সব মরিচ খায় বেশি—সবাই। মেক্সিকোর লাইফও আমাদের মতোই, ফ্যামিলি লাইফ, হট ফুড। এগুলো জিওগ্রাফির কিছু কজ আছে। আমাদের রং অনেক ব্রাইট, ছবি তুললে বোঝা যায়। ইউরোপে ছয় মাস বরফ থাকে। সাদা, একটু ইয়েলো ওকার বা একটু লাইট, ময়লার লাইট, ওদের রংটংও। খাওয়াটা কী, খাওয়াদাওয়া বয়েলড ফুড, ড্রেসিং করে খায়। ওরা তো আমাদের মতো মসলা খায় না।
স্পেনে আমি বলছি যে মেডিটেরিয়ান ডিশ ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট, অ্যান্ড ওয়ার্ল্ডওয়াইড রিকমেন্ডেড যে তোমরা ফলো করো মেডিটেরিয়ান ডিশ। ওদের যে এক্সট্রাভার্জিন অলিভ অয়েল, আমি বলছি যে ডিফারেন্স খুব কম। গ্যাস্ট্রোনমি অব আর্ট, মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট দ্যাট হোয়াট আই অ্যাম ডুয়িং।

আনিসুল হক: 

এখন আপনি এই বাসায়—ধানমন্ডির বাসায় একা থাকেন? একা রান্না করেন, একা ঘর পরিষ্কার করেন, তারপর নিয়মমতো একদম ধ্যানের মতো করে, মেডিটেশনের মতো করে ছবিও আঁকেন। একা থাকাতেই আপনার অসুবিধা হচ্ছে না হচ্ছে না?

মনিরুল ইসলাম: না, হচ্ছে না। কারণ, আই লার্নড হাউ টু লিভ অ্যালোন, লং টাইম। আমি একা কীভাবে থাকতে চাই, থাকা যায়। তারপর আমি চিন্তা করি অনেক সময় আমরা সবাই একা বেসিক্যালি—এটা করোনা খুব ভালোভাবে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। হাউ পুওর উই আর! একসময় প্রিয়জনও দৌড়ে পালায়। তবে এটা একটা হ্যাবিটের ব্যাপার আছে। এখন যে সিস্টেম আসছে। আগে ছিল হরাইজন্টাল লাইফ। ছোট ছোট বাড়ি, আমার বাপ, মা, বোনরা যেত পাড়ায়, প্রত্যেকের বাড়িতে। একটা অন্য রকম রিলেশন ছিল আরকি এবং একটা অন্য ধরনের ছিল। মাঠ ছিল, স্পেস ছিল। ...তো ওইটা নেই এখন। ওই যে ভার্টিক্যাল লাইফ বলতেছি এখন, এই এই এই, অ্যাপার্টমেন্ট অ্যাপার্টমেন্ট অ্যাপার্টমেন্ট। আই ডোন্ট নো মাই নেইবার, আমি ঝামেলাতেও যাই না কিছু হলে।
কিন্তু আগে কারা কী খাইত, সব জানত..., মানে ফ্রেন্ডশিপ ছিল, ট্রাস্ট ছিল সেখানে।
... ওয়ার্ল্ডওয়াইড একটা কালচার গ্রো করছে এখন। ইউরোপিয়ানরা বিয়ে করে না, দে আর লিভিং টুগেদার। ঠিক আছে? কিন্তু দেখা গেছে আমি দেখলাম, যারা লিভিং টুগেদার তারাই লাস্টিং করে মোর দ্যান আ ম্যারিজ। ম্যারিজটা একটা তো মোরাল অবলিগেশন, একটা সাইন, এটা ভেরি পাওয়ারফুল। পেপারটা সাইন করলে এটা ইউ আর অবলিগেটেড, মানে সাইকোলজিক্যালি হোক, আমাদের দেশের কালচার হিসেবে লট অব অবলিগেশন ইউ হ্যাভ টু মেইনটেন। তো এই পারসোনাল জিনিসগুলা আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজ হয়ে যাচ্ছে। এইগুলোর আমি পক্ষপাতী না।
মানুষ চেষ্টা করছে একসময়। একটা ল্যাঙ্গুয়েজ বলে—এসপেরান্তো। এটা এখনো বলে এক মিলিয়ন লোক বা দুই মিলিয়ন লোক, কিছুই না, সাকসেসফুল হয়নি। সেখানে মানুষ চায় না যে একই জিনিস বা একই জায়গা। আমি তাহলে মেক্সিকো যাব কেন? যদি এরা বাংলা বলতেছে বা একই ল্যাঙ্গুয়েজ বলতেছে, একই পাঞ্জাবি পরতেছে, এই যে ভেরিয়েশন ডিফারেন্ট, এটাই তো একটা বিরাট অনুভূতির সৃষ্টি করে মানুষের লাইফে।

আনিসুল হক: 

বাংলাদেশের কোন কোন আর্টিস্টকে আপনার ভালো লাগে? পৃথিবীতে আপনার প্রিয় আর্টিস্ট কে?

মনিরুল ইসলাম: বিগ কোয়েশ্চেন। এটা আমি বলতে পারব না। এটা আমি যদি বলি তোমাকে—সবচেয়ে কোন গানটা ভালো লাগে? কোন গায়কটা ভালো লাগে? সেটা পরিস্থিতির ব্যাপার। এখন রবীন্দ্রসংগীত আমি বিয়েবাড়িতে শুনতে যাব না। সেটার একটা পরিস্থিতি। ...মাইকেল জ্যাকসনের কনসার্টে গিয়েছি, আবার ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকে যাই আমি। সেটা হয় ইন্ডিভিজ্যুয়াল একটা পারসন কি মোমেন্টে সে সিলেক্ট করে ...আমি সব সময় বলি মানুষের তিনটা যদি লাইফ হতো ইট উড বি কারেক্ট। কারণ, আমরা বাঁচি একটা সময় লিমিটেড, হানড্রেড অর এইটি ইয়ার্স হয়তো। তো ফার্স্ট লাইফ যে লাইফে আমরা খালি ভুল পথে যাচ্ছি। এখানে যাই, ওয়ালে একটা ঠোকা লাগে, ওদিকে যাই, ওদিকে লাগে। লাস্ট যে সময়টা পাইলাম, ইউ কান্ট এনজয় দিস।
সেকেন্ড লাইফ যদি হইত ঠিক আছে। আমি ট্রাই করলাম কী হবো বা কী হলাম, পেয়েছি অলরেডি। ওই লাইফে করে গেলাম।
থার্ড লাইফ, ইউ ডোন্ট ডু এনিথিং। নাথিং। জাস্ট শুয়ে বসে বিচে কাটানো। বাট দিস ইজ মাই … যদি মনে হয় ফানি।
...আমাদের অনেকে শুধু করেই যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি, কিন্তু কোনো ফ্রুটস নেই সেখানে। টাইমটা তো খুব শর্ট। আসলে শর্ট। অনেক সময় ব্যাক করলে মনে হয় ১০ বছর কেমনে চলে গেল। আর চেহারা… যে আমরা সব সময় ইয়াং লাইফের ছবি।

আনিসুল হক: 

আপনাকে দেখতে এখনো ইয়াং লাগছে। ৮৩ বছর বয়স।

মনিরুল ইসলাম: স্প্যানিশরা বলে, যদিও ল্যাঙ্গুয়েজটা খারাপ। ৯০ বছরের বুড়িরে যত মেকআপ দাও, বুড়ি বুড়িই। আমার কাছে একটা ওল্ডের ডেফিনেশন আছে—মানুষের যেদিন হিউমার সেন্স চলে যায়, হি ইজ ওল্ড।

মনিরুল ইসলাম: হিউমার সেন্স। হাসে না। আরে হাসতে কি পয়সা লাগে নাকি? একটু নাইসলি ইউ টক। হোয়াই ইউ ভেরি? টাকা বেশি থাকলে ব্যাংকে, তাঁর সাথে অন্যভাবে কথা বলতে হবে? নো। এই রেসপেক্টটা আমি দেখি না। এটা আস্তে আস্তে ডিসপিয়ারিং?

আনিসুল হক: 

আমার লাস্ট প্রশ্ন এটা। শেষ প্রশ্ন। আপনি ছবি আঁকলেন ছোটবেলা থেকে, সেই ক্লাস সেভেনে থেকে। আর্ট কলেজে ভর্তি হলেন। জয়নুল আবেদিন স্যারের পাশে ছবি আঁকলেন। বড় বড় আর্টিস্ট যাঁরা এখন আমাদের, রফিকুন নবী স্যার আপনার সিনিয়র বা কিবরিয়া স্যার আপনার স্যার, শফিক স্যার শেখালেন, তারপর হাশেম খান আপনার বন্ধু। আঁকলেন। সেখান থেকে আপনি বাই চান্স রফিকুন নবী স্যারের কথায় একটা স্কলারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে স্পেনে চলে গেলেন। যেটা ডেস্টিনির মতো লাগে, নিয়তির মতো লাগে, চলে গেলেন। ওইখানে স্বীকৃতি পেলেন ধীরে ধীরে, নিশ্চয়ই সংগ্রাম করতে হলো।

মনিরুল ইসলাম: অবশ্যই।

আনিসুল হক: 

তারপর এখন দেখা যাচ্ছে স্পেনের সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছেন, স্বীকৃতি পেয়েছেন।

মনিরুল ইসলাম: এই যে রয়্যাল মেরিট ওয়ার্ড। এটা ‘স্যার’ আরকি ইংল্যান্ডের। হায়েস্ট সিভিল অ্যাওয়ার্ড।

আনিসুল হক: 

হায়েস্ট সিভিল অ্যাওয়ার্ড। তারপরে আবার বাংলাদেশে এলেন। তিন মাসের জন্য এসে বছরের পর বছর থেকে যাচ্ছেন। আপনার ছবি আমরা সংগ্রহ করি যাঁরা, তাঁরা একটা ছবি পেলেই তো ধন্য মনে করি, না? তারপরও আপনি কেন এই হাজার হাজার ছবি আঁকছেন এবং বলছেন আমার কাজ শেষ হচ্ছে না। ছবি আঁকছি কিন্তু এগুলো শেষ হয় নাই। এই শেষ না হওয়ার…

মনিরুল ইসলাম: এটা একটা ক্রিয়েটিভ প্রসেস, যাঁরা ইনভলভড। ক্রিয়েটিভ প্রসেসের শেষ নেই। এই যে অসন্তুষ্টিটা আমি যদি একটা ছবি ওই দিন ওই মোমেন্টে… আসলে ছবিটা কী? এককথায় বললে, ছবিটা ওই দিন ওই টাইমটারে আমি ওই ক্যানভাসে হোক, পেপারে হোক, ধরে রাখতে চাই। এবং আর্ট ইজ আ ফিল্টার অব আওয়ার লাইফ। ইনার একটা রিফ্রেশমেন্ট। তারপরে ওই যে এটার যে কমিউনিকেশন, এটার সাইকোলজিক্যাল যে এফেক্ট আছে, তারপর আছে অনেক কিছু, যেটা মানুষকে মোর হিউম্যান এবং ...রিলেশন উইথ ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি।
এটা একটা ল্যাঙ্গুয়েজ, যেটা আমি সেখানে সার্থক মনে করি। এই ছবিটা আমি বাংলাদেশে বসে আঁকছি, সেটা আর্জেন্টিনা বা আমেরিকাতে সেম ওয়েট পাচ্ছে, অ্যাপ্রিশিয়েট হচ্ছ। সেটা হলো ইউনিভার্সাল থট নিয়ে। এখন রবীন্দ্রনাথের লেখা গোরা স্পেনেও পড়ানো হয় ইউনিভার্সিটিতে, ৪০টি ইউনিভার্সিটিতে। আরও হয়তো আছে। কেন? উনি তো ইউনিভার্সাল থট নিয়ে কাজ করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে খুব ঝগড়া হতো। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটু গোঁড়া, উনি একটু ইন্ডিয়ান দেশ হইতে হবে, তাঁর নিজের দেশের এগুলো ... থাকতে হবে, এই সব। রবীন্দ্রনাথ বললেন, হ্যাঁ দ্যাটস কারেক্ট। বাট আন্তর্জাতিক একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং, একটা কমিউনিকেশন না হলে ওটা তো ওইখানে পড়ে রইল।
সেটাই যে সত্যজিতের বই ...সিনেমা,... তাঁর ঘটনাগুলো প্যারিসে হতে পারে একটা সাধারণ ফ্যামিলিতেও। এই যে ইউনিভার্সাল থট নিয়ে লেখা, এগুলো আর্ট সব। সিনেমা হোক, বই হোক, কবিতা হোক, অল রোডস আর্কিটেকচার।
ওদিন গেলাম ইন্টেরিয়র ডিজাইন... আরে, দে আর ভেরি রিচ দ্যান আর্কিটেক্ট। ইন্টেরিয়র ডিজাইন যারা করে, দারুণ ব্যাপার, সেই শেরাটন হোটেল, বিগ পার্টি। এটা কই থেকে আসছে? মাইকেলেঞ্জেলো, দা ভিঞ্চি—এরা তো শহর বানাতেন। ... আর্ট থেকে চলে গেছে গার্ডেন ডিজাইনিং, পারসপেক্টিভ ডিজাইন, তারপরে ইন্টেরিয়র ডিজাইন, তারপরে এখন তো থ্রিডি চলে আসছে, এগুলো আর্টিস্টরাই করতেন।
...এখন যদি বলি, সবচেয়ে বড় কমপ্লিট হিউম্যান কে এই পর্যন্ত?—নো ডাউট, লেওনার্দো  দা ভিঞ্চি। তিনি কী ছিলেন না? তিনি ফিলোসফার, রাইটার, থিংকার, ইনভেন্টর, ফিজিশিয়ান, তারপরে কম্পোজার— এ রকম তাঁর ১৪টি গুণ ছিল। ...তাঁর ড্রয়িং নিয়ে এখনো চর্চা হচ্ছে, হেলিকপ্টার তাঁর ... পুরাটা।

আনিসুল হক: 

কিন্তু আপনার ছবি আঁকা শেষ হয় না।

মনিরুল ইসলাম: হয় না।

আনিসুল হক: 

হাজার হাজার ছবিকে কমপ্লিট বলছেন না?

মনিরুল ইসলাম: শেষ হয় না। আমি বলি, কমপ্লিট বলতে কিছু নাই। কমপ্লিট যখন আমি সাইন করে দিই। এইটা একটা অ্যাজ আ আর্টিস্ট ...এটা অনেক বলতে দ্বিধা করেন। নিজের উইক পয়েন্ট আসে। ছবি আঁকতে আঁকতে এরপরে কোনো আইডিয়া নাই,  নো আইডিয়া, ব্লকেজ আসে। যাদের ব্লক আসে না, এরা মহামানুষ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বার্নার্ড শ—এরা লিখেই গেছেন লাইক আ ফাউন্টেন। যেটাই করছে সেটাই ভ্যালিড। এখন আমাদের একটা করতে গেলে ১০টি করতে হয়। বলে না, পিতল যেটারে রোজ ব্রাশ করলে ইটস শাইনার দেন গোল্ড। কিন্তু এটাকে রোজই ব্রাশ করতে হবে। এখন ছবিটা আসলে এটা আমি বলছি অনেক আগে যে এটা মেডিটেটিভ কাজ, এটা লটারি না যে লাইগা গেল। স্পেনড মানি মানে এক্সিবিশন, ঠিক আছে, এক্সিবিশন দরকার।
আমার এক বন্ধু ছিল, ধনী, (সে বলে) আমার তো এক্সিবিশন দরকার নাই। ও বহু ছবি আঁকছে। আমি বললাম, করো করো, এক্সিবিশন করবা না কেন? বলে, কোনো প্রয়োজন নাই। করল একটা এক্সিবিশিন, একটা ছবি বিক্রি হয় নাই। যা–ই হোক, হি ইজ স্যাড। তাঁর টাকার কোনো দরকার নেই কিন্তু। স্পেনে থাকে। সে স্যাড কেন?  সাধারণ সাইকোলজি বা ফিলোসোফি বলি, আমি যা আঁকি, লোকে পছন্দ করেনি, এ জন্য কিনে নাই। এটা সিম্পল কজ দিল আরকি। আবার ওই আর্টিস্ট যখন দেখল একটু খবরের কাগজে উঠছে, কাঁচি খোঁজার জন্য দৌড়াদৌড়ি করছে। এটা কাইটা রাখতে চায়। এই যে কন্ট্রোভার্শিয়াল জিনিসগুলো আমাদের ভেতরে আছে।
এই যে ছবি এইটা আমি ওয়াচ করি, চারদিকে ছবি সাজিয় রাখছি। ওয়ালে কোনো ছবি আমি রাখি না নরমালি। আমার মাদ্রিদের বাড়িতে ওয়ালে কোনো ছবি নাই। এটা আমাকে খুব ইনফ্লুয়েন্স করে। দেখতে দেখতে একটা অড ওয়ার্কও আমারে ইনফ্লুয়েন্স করে। এখন এগুলো ওয়াচ করতে হয়। আসলে ছবিটা তো বোবা, ইট ইজ মোর জেলাস দ্যান ওমেন, আমি বলতেছি আরকি। সে চায় রিয়েল ইউ। গিভ লাভ থট ফর হিম। আমরা তো সিনেমা আর্টিস্ট না। সিনেমা আর্টিস্টরা তো লাইমলাইটে থাকে। আমরা বিহাইন্ড দ্য ক্যানভাস। আমরা যদি সিনেমা আর্টিস্টের মতো বিখ্যাত হতে চাই, দিস ইজ রং টোটাল। আমাদের পরিচিতি আমাদের কাজ নিয়ে, আর কিচ্ছু না। তো এগুলা ইমপ্লিকেশন হচ্ছে অন্যভাবে...। যার যেটা আছে। যা–ই হোক।
আমার মতে যে এতগুলো ছবি আমি রাখতেছি, সবগুলোর মায়া কিন্তু… আমার কাছে ছবির কোনো ইয়া নাই। এই যে ছোট্ট ছবি, নোটবই আছে, এই যে ম্যাগাজিন, এই যে ছবি আঁকতেছি এইগুলো কেউ আঁকবে না। এই যে এখানে ৪০০ ছবি আছে। কিন্তু এগুলো আমি কোনো দিন বিক্রি করব না। এক্সিবিশনও করব না, কেউ দেখবেও না। এটা ভেরি পারসোনাল। নতুন হাত দিয়েছি এগুলোতে।

আনিসুল হক: 

এটা কি পাতা তৈরি করে রাখছেন? পরে আঁকবেন।

মনিরুল ইসলাম: হ্যাঁ। এগুলা সব ইয়া করতে হয়। এগুলোতে আমার সাত দিন গেছে একটা বই তৈরি করতে। এভাবে টাইমগুলো আমার গেছে। সবাই বলে আপনি বিক্রি করবেন না এতগুলো ছবি, দিয়ে যাবেন তো কাউকে? ... মিউজিয়ামে? বলি, ধুর মিয়া, ...মিউজিয়ামের দেখো কী অবস্থা! আবেদিন স্যারের একটা মিউজিয়াম আছে, ধসে পড়তেছে। কেউ নোটিশই করে না। সুলতানের মিউজিয়ামে এতগুলো ধুলা। আমাদের ট্রেন্ড হয় নাই এখনো মিউজিয়ামের। মিউজিয়াম জাদুঘর, একটা বেসিক হার্ট অব দ্য মিউজিয়ামে, সুন্দর একটা কফিহাউস থাকবে। মানুষ তো ছবি দেখতে যায় না। ফ্যামিলি নিয়ে যায়, দৌড়াদৌড়ি করবে। প্রথমে খেতে যাবে। এটা কেন হয় না আমি জানি না। এটা ইজি টু মেইনটেন, এটা হওয়া একান্ত দরকার। হ্যাঁ লো প্রাইজ এবং ক্লিন, এইটা একটা মিউজিয়ামের, তারপর শপিং সেন্টারে একটা যারা এটা হার্ট ব্রিদ করে। মিউজিয়ামের রিলেটেড পোস্টার হতে পারে, চায়ের কাপ হতে পারে।

আনিসুল হক: 

সারা পৃথিবীর সব গ্যালারিতে আছে।

মনিরুল ইসলাম: আমি বলি, ছবিটা করবেন কি? আমার কোনো উত্তর ছিল না। এখন দিয়ে দিই। দে উইশ গো টু দেয়ার ওউন ডেস্টিনি। তারা তাদের নিজের গন্তব্যে যাবে। আই ডোন্ট নো। কিন্তু আমি যে এনজয় করছি, প্রতিটি ছবিতে ওয়েট করছি, মিরাকেল কিছু ঘটে কি না। দ্যাট ইজ দ্য মোস্ট বিউটিফুল মোমেন্ট। যেটা আমাকে যে আনন্দ দেয়, সেটা কিছু দিতে পারব না। কিন্তু লাস্টে একটা করলে তো, আনন্দিত হয়ে বসে থাকলে, তো আর হলো না। তাহলে তো আই অ্যাম হ্যাপি ম্যান। তাহলে তো ক্রিয়েটিভ আর কিছু দরকার নেই। এটা চলে যায়, নেক্সট ডেতে, এগেইন এগেইন। ডাউট থাকে ছবিতে। ছবির আনফিনিশড, কোনটা ফিনিশ, কোনটা… তারপরে অনেক আছে, বলে এটা কদিন থাকবে এই ছবি? বাংলাদেশ তো ওর্স্ট সিজন টু প্রিজারভ। পেপারের আয়ু... আমি নিজে কাগজ তৈরি করছি, পারফেক্ট। ৪০ বছর আগের ছবি আছে আমার। পেপারের লাইফ কিন্তু ক্যানভাস থেকে বেশি, আমরা জানতাম না। মানুষ সেটাই ভাবে, ক্যানভাস। কিন্তু পেপারে আমি যে ছবি আঁকলাম, একই ছবি একই ইমেজ ক্যানভাসে যেটা আঁকলাম, দুইটার দুইটা প্রাইজ কেন হবে? ওই যে মানুষ ডিভ্যালুজ করে। দেখে আসে ছবি হয় ক্যানভাসে মিউজিয়ামে, দিস ইজ দ্য থিং অনলি। তো এইগুলো কনসেপ্ট ইয়া করতে অনেক টাইম লাগবে। হবে কি না আমি জানি না। তারপর আর্ট কোথায় যায়। আমরা এখন আসছি একটা যুগে কত ধরনের আর্ট। গোলাপ নিয়া রাস্তায় হাফ নুড হয়ে গোলাপ ফুল কাটে—এটা একটা আর্ট হয়ে গেল। আছে না এ ধরনের ইনস্টলেশন!

আনিসুল হক: 

কলাটা যে ঝুলে রাখল ওইটা যে কোটি কোটি টাকায় বিক্রি হলো।

মনিরুল ইসলাম: দিস ইজ প্রোভোকেশন, প্রোভোকেশন। আমি বললাম হ্যাঁ। এই যে আমার ছেলের গল্প করলাম বা মেয়ে থাক... অস্ট্রেলিয়াতে গেছে স্কলারশিপ, একই সুর। আমি যখন ডেন্টিস্টের কাছে যাই, এক লোক মিলিটারি ম্যান ওল্ড ম্যান, একই জিনিস বলে আমারে খালি—আমার ভাইজানের দুইটা ছেলে বড় ব্যাংকে কাজ করছে। আর মেয়েটা আছে অস্ট্রেলিয়ায়। আমি বললাম, ভাই ভেরি গুড, ভেরি গুড। তো আপনি যে পাঠিয়েছেন আসবে নাকি আসবে না? কয়, জানি না আসবে কি না। আমি বললাম, শোনেন, এখন তো বেশির ভাগ ফ্রোজেন ডেডবডি আইসা দেখে ছেলেরা। এটাই হয়ে গেছে কালচার। মরলে পরে চার দিন রেখে দেবে, বক্সে, তারপর ছেলে আসবে বাইরে থেকে দেখবে। আমার কাছে এটা খুব কঠিন জিনিস লাগে।
মানুষ কিন্তু এখন প্রভোকেশনটাই মনে রাখে। প্রভোকেশন দ্যাট মিনস তখন যদি বলে যে, জানেন আমার তো মেয়েটা একটু ড্রাগ ধরছে। বলবে, বলেন কী? হি ইজ ইন্টারেস্টেড টু নো। তখন বলবে, বলেন বলেন। মানুষ হয়ে গেছে এখন নেগেটিভ দিকে (আগ্রহী)। নিউজ ফর ইজ গুড নিউজ ব্যাড নিউজ, ব্যাড নিউজ গুড নিউজ। এখন ব্যাড নিউজ প্রথমে দেখে কটা কীভাবে ইয়া হলো মানুষ, টিভিতে স্ক্রিনে দেখে …তো মানুষ আমরা সব ওয়ার্ল্ডের একই জিনিস। কোনো জায়গায় একটা অন্য রকম পরিস্থিতি, এমন না। একই হয়ে গেছে সব। গ্লোবালাইজিং জিনিসটা আমি পক্ষপাতী না, আগেই বলছি। যে কিছুটা আমাদের রাখা দরকার নিজেদের যতটুকু ঐতিহ্য। আই সাপোর্ট দ্য ফোক আর্ট। এটার ব্যবস্থা করুক, রাখুক, ছেলেরা দেখুক। নিজের বাপ–দাদা যদি ভুলে যায়, কষ্টকর ব্যাপার এটা।

আনিসুল হক: 

মনির ভাই অনেক কথা হলো অনেক ধন্যবাদ জীবনের গভীর উপলব্ধির কথা আমরা জানতে পারলাম। দর্শকমণ্ডলী আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আশা করি ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলামের এই জীবনের অভিজ্ঞতা—শিল্পীর অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের এবং আমাদের আলোকিত করবে। সবাই ভালো থাকুন।

সাক্ষাৎকার আনিসুল হক ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো

০ মন্তব্য


কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!